মালিক ইবনে দিনার (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন একজন ধার্মিক এবং (আল্লাহর প্রতি) অনুগত ইমাম। কেউ একথা কল্পনাও করতে পারে না যে, এক সময় তিনি খুব রূঢ় ও অবাধ্য মানুষ ছিলেন। তাঁর তওবা করার গল্পটি আমাদের দেখায় যে, কোনো মানুষ – সে যতো খারাপই হোক না কেন – আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার অযোগ্য নয়।
ইবনে দিনার ছিলেন খুব অত্যাচারী লোক। কেননা তিনি ছিলেন নীতিহীন ও মাতাল। এমনকি তিনি সুদের ব্যবসাও করতেন, যার কারণে লোকজন তাকে ঘৃণা করতো ও এড়িয়ে চলতো। তার একটি ছোট মেয়ে ছিলো যাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। মাত্র তিন বছর বয়সে যখন তার মেয়ের মৃত্যু হয়, তিনি উন্মত্তপ্রায় এবং শোকে কাতর হয়ে পড়েন, আর মদপান করতে থাকেন যতক্ষণ না তার হুঁশ চলে যায়।

এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি কিয়ামত প্রত্যক্ষ করছেন এবং একটি ভয়ঙ্কর সাপ তাকে ছোবল মারছে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ইবনে দিনার যখন পালানোর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না, একজন বৃদ্ধ লোক ছাড়া তিনি আর কাউকেই দেখলেন না এবং তার দিকে ছুটতে লাগলেন। তাকে সাহায্য করার পক্ষে লোকটি ছিলো খুবই দুর্বল, তবে তিনি ইবনে দিনারকে অন্য একটি পথের দিকে নির্দেশ করলেন। আর ইবনে দিনার ঠিক ততক্ষণ দৌড়াতে থাকলেন যতক্ষণ না তিনি নিজেকে জাহান্নামের কিনারায় আবিষ্কার করলেন।
ভীতসন্ত্রস্ত ইবনে দিনার পুনরায় বৃদ্ধ লোকটির কাছে ছুটে গেলেন এবং তাকে উদ্ধার করার জন্য অনুরোধ করলেন। কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধ লোকটি তাকে বললো, “দেখতেই পাচ্ছো আমি দুর্বল। আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবো না।” তারপর তিনি ইবনে দিনারকে আরেক দিকে ছুটতে বললেন, আর ইবনে দিনার তা-ই করলেন। তিনি যখন ছুটছিলেন তখন দেখলেন সাপটি তার খুব নিকটবর্তী এবং তাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলো। হঠাৎ তিনি দেখলেন তার ছোট মেয়ে তাকে সাপের হাত থেকে বাঁচাতে এসেছে।
এতক্ষণ যা কিছু ঘটে গেলো তার জন্য খুব ভীতসন্ত্রস্ত থাকলেও মেয়েকে দেখে ইবনে দিনার স্বস্তি পেলেন এবং মেয়ের হাত ধরে দুজন একসাথে বসলেন, ঠিক আগে যেভাবে তারা বসতেন। তারপর মেয়েটি তার বাবাকে এই প্রশ্নটি করলোঃ
বাবা!

“যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?”
[সূরা আল-হাদিদঃ ১৬]
ইবনে দিনার বললেন, “মা! আমাকে সাপটি সম্পর্কে বলো।” তখন মেয়ে বললো, “এটি ছিলো আপনার খারাপ কাজ যা আপনি স্তুপাকারে জমা করছিলেন যতক্ষণ না তা আপনাকে প্রায় গিলে ফেললো। বাবা, আপনি কি জানেন না যে, একজন মানুষ দুনিয়াতে যে ‘আমল করবে কিয়ামতের দিন একত্রে সেগুলো তার সাথে মিলিত হবে? আর বৃদ্ধ লোকটি ছিলো আপনার ভালো কাজ, যেগুলো খুব সামান্য এবং দুর্বল, তাই তা আপনার অবস্থা দেখে কাঁদছিলো এবং আপনাকে সাহায্য করার অপারগতা প্রকাশ করছিলো। যদি এতো অল্প বয়সে আপনার মেয়ে মারা না যেতো তবে দুনিয়াতে করা আপনার ভালো কাজ কোনো উপকারেই আসতো না।”
ইবনে দিনার জেগে উঠলেন এবং চিৎকার করে বললেন, “হে আমার রব, এখনই (আমি তওবাহ করলাম); হে আল্লাহ! এখনই। হ্যাঁ, এখনই।” তারপর তিনি উযূ করে ফযরের সালাত আদায়ের জন্য মসজিদের দিকে রওয়ানা হলেন এবং তওবাহ করে আল্লাহর দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করলেন। মসজিদে প্রবেশ করেই তিনি শুনতে পেলেন ইমাম সাহেব ঠিক সেই আয়াতটিই তিলাওয়াত করছেন যেটি তার মেয়ে তাকে স্বপ্নের মধ্যে বলেছিলো।
বস্তুতঃ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের প্রতি পূর্ণ সচেতন যারা তার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চায়। আর তাঁর অসীম দয়ার কারণে তিনি প্রতিনিয়ত তাদের সুযোগ দিয়ে যান যাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে এবং তাঁর নিকটবর্তী হতে পারে।
তওবাহ করার পর ইবনে দিনার সালাতের প্রতি একনিষ্ঠতা এবং রাতজুড়ে দু’আ ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেন। তিনি বলতেন, “হে আল্লাহ, একমাত্র আপনিই জানেন কে জান্নাতের বাসিন্দা হবে, আর কে হবে জাহান্নামের বাসিন্দা। আমিই বা কোন দলের অংশ? হে আল্লাহ, আমাকে জান্নাতের বাসিন্দাদের সাথে যোগ দেওয়ার সুযোগ দিন এবং জাহান্নামবাসিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে মুক্তি দিন।”
চরম অত্যাচারী, মদ্যপ এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের প্রতি অবহেলাকারী থেকে ইবনে দিনার বিখ্যাত ধার্মিক ‘আলিমে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। অসম্মানের পাত্র হওয়ার পরও তিনি এমনই পরিবর্তিত হয়েছিলেন যে, আজও মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধার সাথে তাঁর কথা স্মরণ করে এবং মহান আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণের জন্য দু’আ করে। এক সময় যেই মানুষটির‘আমল তাকে জাহান্নামের বাসিন্দা করে দিতে পারতো, আমরা আশা করি সেই ইবনে দিনার চিরকাল জান্নাতে বাস করবেন।

এটি ছিলো মহান আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিনের কাছে ইবনে দিনারের আন্তরিক তওবার গল্প।
এখন আমার, আপনার অবস্থা কী? ঠিক এই মুহূর্তে আমরা কী ধরনের মানুষ? আমরা কী ভালোর দিকে পরিবর্তিত হবো? প্রকৃতপক্ষে আমাদের উচিত কোনো সময় নষ্ট না করে লক্ষ্য স্থির করা এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা যাতে আমরা সফল হতে পারি।
ইবনে দিনার বলেন,
“কোনো কোনো হাদীসগ্রন্থে আমি পড়েছি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “অবশ্যই আমি আল্লাহ, রাজন্যবর্গের অধিপতি, সম্রাটদের সম্রাট। রাজাদের অন্তর আমার নিয়ন্ত্রণাধীন। বান্দাগণ যখন আমার আনুগত্য করে, তখন তাদের রাজা বাদশাহদের অন্তরকে রহমত ও করুণার সমন্বয়ে তাদের দিকে ঘুরিয়ে দেই। আর যখন বান্দারা আমার অবাধ্যতা অবলম্বন করে,তখন তাদের রাজা বাদশাহদের অন্তরকে রাগ ও কঠোরতার দিকে ঝুঁকিয়ে দেই, যার ফলে তারা প্রজাদের কঠিন শাস্তি আস্বাদন করায়। সুতরাং রাজা বাদশাহদের অপমান করায় নিজেদের ব্যস্ত রেখো না, বরং আমার নিকট তওবাহ করো, ফলে আমি রাজা বাদশাহদের অন্তরে তোমাদের জন্য করুণা ও সহানুভূতি স্থাপন করে দিবো।”
[সাফওয়াত আত-তাফাসীর, খণ্ড ১, পৃ. ৪১৯]
চলুন আমরা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করি, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর সাথে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করি। ইনশা আল্লাহ একমাত্র তখনই পুরো মুসলিম উম্মাহ (ইসলামের উপর) অবিচল এবং তওবার ফল ভোগ করতে পারবে।

নবীজির প্রতি আবু বকরের রা: ভালোবাসা

হজরত আবু বকর রা: ছিলেন নবীজির সবচেয়ে প্রিয় সাহাবি। যিনি সিদ্দিকে আকবর নামে পরিচিত। তার উপাধি ছিল ‘আতিক’। ইসলামের দাওয়াত পাওয়ার পর যিনি হজরত রাসূল সা:কে নওবুয়ত সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করেননি তিনি হলেন হজরত আবু বকর রা:। হজরত নবী সা: বলেন, আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, সবার মধ্যে কম-বেশি সংশয় দ্বিধা অবশ্যই দেখেছি; কিন্তু আবু বকরের মধ্যে কোনো প্রকার সংশয় দেখিনি, দাওয়াতের সাথে সাথে আবু বকর কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গিয়েছে। হজরত মুহাম্মদ সা:-এর প্রতি আবু বকরের ভালোবাসা অতুলনীয় ছিল। তিনি নবীজির প্রতি এমন ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন, যা পরে আর কোনো সাহাবা আবু বকরের ভালোবাসাকে অতিক্রম করতে পারেননি। মুসলমানের সংখ্যা যখন মাত্র ৩৯ জন, তখন আবু বকর নবীজির কাছে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য অনুমতি চাইলেন। নবীজি আবু বকরের কাকুতি মিনতিতে অনুমতি দিয়েছিলেন। আবু বকর ৩৯ জন মুসলমানকে নিয়ে কাবা শরিফে উপস্থিত হয়ে খুতবা (ভাষণ) দিলেন, যা বায়তুল্লাহ শরিফে মুসলমানদের প্রথম খুতবা। এদিন ছিল মুসলমানের প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের প্রথম দিন। খুতবার শুরুতে কাফেররা আবু বকরকে বেদম প্রহার করে পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। প্রচণ্ড আঘাতের ফলে আবু বকর অজ্ঞান হয়ে পড়লে অন্য সাহাবিরা তাকে বাড়ি নিয়ে গেলেন।

দীর্ঘ সময় পর জ্ঞান ফিরলে আবু বকর সর্ব প্রথম জানতে চাইলেন- রাসূল সা:-এর কী অবস্থা, তিনি কোথায়? আবু বকরের জন্য খানাপিনার ব্যবস্থা করা হলো। তিনি বললেন, আমি রাসূল সা:-এর সাথে সাক্ষাৎ না করা পর্যন্ত কোনো খাবার খাবো না। মক্কায় যখন কাফেরদের অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেল, তখন নবীজি হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন। নবীজি সা: আবু বকরকে ডেকে বললেন, তোমাকে আমার সাথে যেকোনো সময় মদিনায় হিজরত করতে হবে। নবীজি এ কথা বলার পর চার মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে হঠাৎ এক দিন রাতে আবু বকরের দরজায় নবীজি উপস্থিত হয়ে কড়া নাড়লেন। প্রথম ডাকের সাথে সাথে আবু বকর সাড়া দিলেন। নবীজি আর্শ্চায হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু বকর! তুমি এখনো ঘুমাওনি? আবু বকর বললেন, হুজুর আপনি যেদিন হিজরতের কথা বলেছেন, সেদিন থেকে আমি আর বিছানায় গা লাগাইনি। আমি রোজ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করি। যদি রাসূল সা: আমার ঘরের দরজায় এসে আমাকে না পেয়ে ফিরে যান।

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় আবু বকর নবীজিরর সাথে সাওর পাহাড়ের গুহায় অবস্থান করেছিলেন। অন্ধকার গুহার মধ্যে সাপ বিচ্ছু থাকতে পারে এই ভেবে আবু বকর প্রথমে গুহায় নেমে গুহা পরিষ্কার করলেন। গায়ের জামা দিয়ে গুহার ভেতরের প্রত্যেকটি গর্তের মুখ বন্ধ করে দেয়ার পর একটি গর্তের মুখ বন্ধ করা বাকি ছিল। গর্তের মুখ বন্ধ করার মতো আবু বকরের কাছে কিছুই ছিল না। অবশেষে আবু বকর নিজের পা দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে রাখেন। একপর্যায়ে একটি সাপ আবু বকরকে ছোবল দিলো। আবু বকরের পুরো শরীর বিষে কালো হয়ে গেল। আবু বকরের ঊরুতে মাথা রেখে নবীজি আরাম করছিলেন। তারপরও নবীজিকে আবু বকর ডাকেননি। এই ভেবে যে, নবীজির আরাম নষ্ট হবে। নবীজির কষ্ট হবে। বিষের যন্ত্রণায় চোখের পানির ফোটা যখন নবীজির শরীর মোবারকের ওপর গিয়ে পড়ল। নবীজি চোখ খুলে জিজ্ঞাস করলেন আবু বকর কাঁদছ কেন? এরপর আবু বকরের মুখ থেকে সব ঘটনা শুনে নবীজি বিস্মিত হয়েছিলেন। অতঃপর নবীজি তাঁর মুখের লালা সাপের ছোবলের স্থানে লাগিয়ে দিলেন। সাথে সাথে আবু বকর সুস্থ হয়ে গেলেন। তাবুকের যুদ্ধের পর নবীজি সবাইকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা দেয়ার আদেশ করলেন, সবাই সামর্থানুযায়ী খেদমত নিয়ে এলো।

সবাই সাধ্যানুযায়ী খেদমত এনে রাসূল সা:-এর সামনে উপস্থাপন করল। সবার খেদমত দেখে হজরত ওমর মনে মনে ভাবলেন, আজ নবীজির আদেশ পালনে আমি প্রথম হবো। নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন, হে ওমর! তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? হজরত ওমর বললেন, ঘরে যা ছিল তা থেকে সবকিছুর অর্ধেক নিয়ে এসেছি। এবার নবীজি আবু বকরকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! তুমি ঘরের মধ্যে কী রেখে এসেছ? আবু বকর বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আবু বকরের এই কথা শুনে হজরত ওমর রা: বললেন, আপসোস! আমি আবু বকরের চেয়ে উত্তম হতে পারলাম না। আবু বকরের চরিত্র, সত্যবাদিতা, ত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আবু বকর নবীজির প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন।
আল্লাহ পাক কোরআনে বলেন, ‘রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্বানের মতো মনে করো না’ (সূরা নূর: ৬৩)। হজরত আবু বকর রা: হজরত রাসূল সা:-এর হুকুমকে কখনো সাধারণ মানুষের হুকুমের মতো মনে করতেন না। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ পাককে ভালোবাস, তাহলে আমার কথা মেনে চলো (আমাকে ভালোবাস), আল্লাহ পাকও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন’ (সূরা আল ইমরান : ৩১)। আমরা যদি নবীজিকে মানি ভালোবাসি তাহলে হজরত আবু বকরের মতো ভালোবাসতে হবে। রাসূলের সুন্নত ও আদেশ নির্দেশ পালনে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। তা হলেই রাসূল সা:কে ভালোবাসা হবে।
লেখক : প্রবন্ধকার

যে তিন শ্রেণীর ব্যক্তিকে আঘাত করলে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে

ইসলাম সকল শ্রেণীর মানুষের অধিকারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। সমাজের যারা প্রতিবন্ধীদের অবহেলা ও অবজ্ঞার চোখে দেখে, তাদের মনে রাখা দরকার, (আল্লাহ না করুন) বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও অসুস্থতার কারণে একজন সুস্থ-সবল মানুষও যে কোনো সময় শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে পারে। তাই প্রত্যেক সুস্থ মানুষের উচিত, শারীরিক সুস্থতার জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়ানো। কারণ তাদেরও অধিকার রয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাপনের। ইসলাম প্রতিবন্ধীদের প্রতি সচেতন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (বিত্তশালী) ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ –সূরা জারিয়াত : ১৯ প্রতিবন্ধী, পাগল, অবলা বা নারীদের শরীরে আঘাত করলে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সমাজের সব শ্রেণীর মানুষকে সমান চোখে দেখতেন। মৃদু বাকপ্রতিবন্ধী সাহাবি হজরত বেলালকে (রা.) মসজিদে প্রথম মোয়াজ্জিন নিয়োগ দিয়েছিলেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে (রা.) নবী করিম (সা.) দু’দু’বার মদিনার অস্থায়ী শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এমনকি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই তাকে (আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম) দেখতেন, তখনই বলতেন, ‘স্বাগতম জানাই তাকে, যার সম্পর্কে আমার আল্লাহ আমাকে ভর্ৎসনা করেছেন।’ উল্লেখ্য যে, নবী করিম (সা.) সাহাবি আবদুল্লাহ উম্মে মাকতুমকে (রা.) কোনো এক বিষয়ে অগ্রাধিকার না দেয়ায় আল্লাহতায়ালার সতর্কীকরণের মুখে পড়েন।

ঘটনাটি হলো- একদা নবী করিম (সা.) কোরাইশ নেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনারত ছিলেন। এমতাবস্থায় অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) সেখানে উপস্থিত হয়ে নবী করিমকে (সা.) দ্বীন সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এতে আলোচনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে নবী করিম (সা.) কিঞ্চিৎ বিরক্তি প্রকাশ করেন। নবী করিম (সা.) মক্কার জাত্যভিমানী কোরাইশদের মন রক্ষার্থে অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের প্রতি তখন ভ্রুক্ষেপ করলেন না। কিন্তু আল্লাহর কাছে এ বিষয়টি পছন্দনীয় হলো না। সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবন্ধীদের অধিকারবিষয়ক পবিত্র কোরআনে কারিমের আয়াত নাজিল হয়; যাতে তাদের প্রতি ইসলামের কোমল মনোভাবের প্রকাশ পেয়েছে।

ওই আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে ভ্রুকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল, কারণ তার কাছে অন্ধ লোকটি এল। তুমি কেমন করে জানবে, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো অথবা উপদেশ গ্রহণ করত। ফলে উপদেশ তার উপকারে আসত।’ -সূরা আবাসা : ১-৪ এরপর থেকে নবী করিম (সা.) প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে সতর্ক হয়ে যান। তাদের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে তাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকেন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন নবী করিমের (সা.) সুন্নতও বটে। যেখানে নবীকে (সা.) আল্লাহ সতর্ক করেছেন, সেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিবন্ধীদের প্রতি উদাসীনতা দেখালে নিশ্চয়ই আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন, এটা বলাবাহুল্য। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সমাজে সেই মানুষেরই একটা অংশ প্রতিবন্ধী। তারা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাছাড়া প্রতিবন্ধীদের প্রতি সহমর্মিতা পরকালে মুক্তির উসিলা। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো তাদেরও ন্যায্যপ্রাপ্য। তাই প্রতিবন্ধীদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়া অত্যাবশ্যক। যেমননি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ (প্রতিবন্ধী) ব্যক্তির খোঁজখবর নাও এবং বন্দীকে মুক্ত করে দাও।’ –সহিহ বোখারি

Comments

comments

SHARE