যে পাঁচটি সুন্নাত অমান্য করার কারণে দাম্পত্য জীবন সুখের হচ্ছে না!

আমরা আমাদের দৈনন্দিনের কাজ নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে একে অপরকে (স্বামী-স্ত্রী) সময় দিতে পারি না। সৌভাগ্যক্রমে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে একটি নিখুঁত প্রতিকৃতি মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন। রাসুলের (সা.) সুন্নাত অনুসরণের মাঝেই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা।এখানে পাঁচটি কার্যকর-শক্তিশালী নববী দিক নিদের্শনা তুলে ধরা হলো।

একে অপরের (স্বামী-স্ত্রী) সাথে হাস্যোজ্জ্বল থাকা : আমাদের রাসুল (>সা.) বেশিরভাগ সময়ই হাস্যোজ্জ্বল থাকতেন। এমনকি রাসুলের (সা.) স্ত্রীরা বলতেন যে, আমরা তার থেকে বেশি হাস্যোজ্জ্বল অবয়বময় আর কাউকে দেখিনি । এটা ভুলে গেলে চলবে না যে- একটি হাসি কতটা পাওয়ারফুল হতে পারে। স্বামী-স্ত্রী সুখে এবং দুঃখে সব সময়ই এক সাথে থাকে। সুতরাং নিজেদের মুখ গোমরা না করে রেখে সদা হাস্যোজ্জ্বল রাখাই হবে উভয়ের কতর্ব্য। এছাড়াও আমাদের নবী (সা.) বলেছেন, একটি হাসিও হতে পারে সদকা। (আল-হাদিস)

একে অপরের (স্বামী-স্ত্রী) সাথে ভালো কথা বলুন : আমাদের নবী (সা.) বলেন, যে আল্লাহকে এবং শেষ দিবসকে বিশ্বাস করে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। (আল-হাদিস) এটা স্বামীদের কর্তব্য, বিশেষত যখন স্বামী-স্ত্রী কাছাকাছি থাকেন। সুতরাং প্রতিদিন আপনি আপনার স্ত্রীর প্রশংসা করার চেষ্টা করুন।
একে অপরের (স্বামী-স্ত্রী) ওপর রাগ করবেন না : যখন হজরত আলী (রা.) হজরত ফাতেমাকে (রা) বিবাহ করেছেন, তখন রাসূল (সা.) হজরত আলীকে (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন। উপদেশটা এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যে, আমাদের নবী সেটাকে তিনবার বলেছেন। উপদেশটি হলো- পারিবারিক কোনো কারণে তুমি রাগ করবে না।

স্বামী-স্ত্রী একসাথে ঘুরতে বের হন : আমাদের রাসূল (সা.) স্ত্রীদের সাথে অনেক সময় কাটাতেন। তিনি এক ছাদের নিচে আলাদা আলাদা থাকতেন না। নবী (সা.) স্ত্রীকে সাথে নিয়ে হাঁটতে বের হতেন। ঘুরতে যেতেন। এমনকি বিভিন্ন কাজে তার পরামর্শও নিতেন।

স্ত্রীকে বলুন, আমি তোমাকে ভালোবাসি : আল্লাহর নবী (সা.) কখনো এটা বলতে ভয় করেননি। আমাদের ধর্মের এমনটা বলতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কেননা এই কথা পারিবারিক অনেক সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে।

সুখী দাম্পত্য জীবন একটি নেয়ামত!!!

হুদহুদ পাখির ঘটনা [ইসলামিক গল্প]

হযরত সুলায়মান (আঃ) আল্লাহর হুকুমে পক্ষীকুলের আনুগত্য লাভ করেন। একদিন তিনি পক্ষীকুলকে ডেকে একত্রিত করেন ও তাদের ভাল-মন্দ খোঁজ-খবর নেন। তখন দেখতে পেলেন যে, ‘হুদহুদ’ পাখিটা নেই। তিনি অনতিবিলম্বে তাকে ধরে আনার জন্য কড়া নির্দেশ জারি করলেন। উক্ত ঘটনা কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ: ‘সুলায়মান পক্ষীকুলের খোঁজ-খবর নিল। অতঃপর বলল, কি হ’ল হুদহুদকে দেখছি না যে? না-কি সে অনুপস্থিত’ (নমল ২০)। সে বলল, ‘আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা যবহ করব অথবা সে উপস্থিত করবে উপযুক্ত কারণ’ (২১)। ‘কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ এসে হাযির হয়ে বলল, (হে বাদশাহ!) আপনি যে বিষয়ে অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার নিকটে ‘সাবা’ থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি’ (নমল ২৭/২০-২২)। ‘আমি এক মহিলাকে (রাণী বিলক্বীস) সাবা বাসীদের উপরে রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেওয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে’ (২৩)।

 

‘আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলীকে সুশোভিত করেছে। অতঃপর তাদেরকে সত্যপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। ফলে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হয় না’ (নমল ২৭/২৩-২৪)। উল্লেখ্য যে, ‘হুদহুদ’ এক জাতীয় ছোট্ট পাখির নাম। যা পক্ষীকুলের মধ্যে অতীব ক্ষুদ্র ও দুর্বল এবং যার সংখ্যাও দুনিয়াতে খুবই কম। বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) একদা নও মুসলিম ইহুদী পন্ডিত আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, এতসব পাখী থাকতে বিশেষভাবে ‘হুদহুদ’ পাখির খোঁজ নেওয়ার কারণ কি ছিল? জওয়াবে তিনি বলেন, সুলায়মান (আঃ) তাঁর বিশাল বাহিনীসহ ঐসময় এমন এক অঞ্চলে ছিলেন, যেখানে পানি ছিল না। আল্লাহ তা‘আলা হুদহুদ পাখিকে এই বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, সে ভূগর্ভের বস্ত্ত সমূহকে এবং ভূগর্ভে প্রবাহিত পানি উপর থেকে দেখতে পায়। হযরত সুলায়মান (আঃ) হুদহুদকে এজন্যেই বিশেষভাবে খোঁজ করছিলেন যে,

এতদঞ্চলে কোথায় মরুগর্ভে পানি লুক্কায়িত আছে, সেটা জেনে নিয়ে সেখানে জিন দ্বারা খনন করে যাতে দ্রুত পানি উত্তোলনের ব্যবস্থা করা যায়’। একদা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) ‘হুদহুদ’ পাখি সম্পর্কে বর্ণনা করছিলেন। তখন নাফে‘ ইবনুল আযরক্ব তাঁকে বলেন, ‘জেনে নিন হে মহা জ্ঞানী! হুদহুদ পাখি মাটির গভীরে দেখতে পায়। কিন্তু (তাকে ধরার জন্য) মাটির উপরে বিস্তৃত জাল সে দেখতে পায় না। যখন সে তাতে পতিত হয়’। জবাবে ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ﺇﺫﺍ ﺟﺎﺀ ﺍﻟﻘَﺪَﺭُ ﻋَﻤِﻰَ ﺍﻟﺒَﺼَﺮُ ‘যখন তাক্বদীর এসে যায়, চক্ষু অন্ধ হয়ে যায়’। চমৎকার এ জবাবে মুগ্ধ হয়ে ইবনুল ‘আরাবী বলেন, ﻻﻳَﻘْﺪِﺭُ ﻋﻠﻰ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺠﻮﺍﺏِ ﺇﻻ ﻋﺎﻟِﻢُ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥِ ‘এরূপ জওয়াব দিতে কেউ সক্ষম হয় না, কুরআনের আলেম ব্যতীত’। [ কুরতুবী, তাফসীর সূরা নমল ২০ আয়াত ]

নবীজির চোখে সবচেয়ে বড় চোর কে?

সাধারণত যে ব্যক্তি অন্যের অগোচরে তার জিনিস কুক্ষিগত করে তাকে আমরা চোর বলে জানি। শরীয়তের দৃষ্টিতেও একে চোর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু হাদীস শরীফে সবচেয়ে বড় এবং জঘন্য চোর বলতে অন্য আরেকজনকে বুঝানো হয়েছে। অথচ সেই ব্যক্তি কোন চুরির কাজ করেনি। তারপরেও তাকে নবীজি (সা.) সবচেয়ে বড় চোর এবং জঘন্য চোর বলে আখ্যায়িত করেছেন।

নামাজ বেহেশতের চাবি। নামাজ ছাড়া জান্নাতের দরজা খুলা হবে না। নিয়মিত ফরয নামাজ আদায়ের মাধ্যমেই জান্নাতের দরজা খুলা হবে। হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম এ নামাজেরই হিসাব নেওয়া হবে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ৮২ বার নামাজের আদেশ করা হয়েছে।

হাদীসে এসেছে, রাসুল সা. বলেছেন, ‘সবচেয়ে জঘন্য চোর হলো সে ব্যক্তি যে নামাজে চুরি করে। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসুল সা: নামাজে চুরির অর্থ? তিনি বললেন, সে রুকু ও সিজদা ঠিকভাবে করে না।’ (তাবরানি ও ইবনে খোজায়মা)

আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা যারা নিজেদের নামাজে ভীতি ও বিনয় অবলম্বন করে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।’ রাসুল সা. বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেয়া হবে। বান্দাহ যদি সন্তোষজনকভাবে নামাজের হিসাব দিতে পারে, তবে সে অন্যান্য আমলেও কামিয়াব হয়ে যাবে। আর যদি সে নামাজের হিসাব সন্তোষজনকভাবে দিতে না পারে, তবে তার অন্য আমলেও খারাপ হবে। আল্লাহর ঘরের আবাদকারী ও তার সেবাকারী লোকেরা আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ।’

তাছাড়া বিনা কারণে একাকী নামাজ পড়া ঠিক নয়। জামায়াতে নামাজের ব্যাপারে রাসুল সা. খুব বেশি তাকিদ দিতেন। এ বিষয়ে রাসুল সা. বলেছেন, ‘কসম সেই সত্তার, যার হাতে আমার জীবন! আমার ইচ্ছা হয়, কাঠ-খড়ি জমা করার নির্দেশ দিতে। অতঃপর কোনো একজনকে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখতে, কে কে নামাজ পড়তে আসেনি।’ অপর এক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, ‘আমার ইচ্ছা হয়, যারা আজান শুনে মসজিদে হাজির হয় না তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

অন্য আরেক হাদীসে এসেছে, রাসুল সা. বলেছেন, ‘একবার এক অন্ধ ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ সা. আমার এমন কেউ নেই যে আমাকে হাত ধরে মসজিদে আনবে। অতঃপর লোকটি মসজিদে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি ও ঘরে নামাজ পড়ার অনুমতি চান। রাসুল সা. ঘরে নামাজ পড়ার অনুমতি দেন। অনুমতি পেয়ে সেই লোকটি বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলে রাসুল সা. আবার তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাস করেন, তুমি কি আজান শুনতে পাও? লোকটি বললেন, হ্যাঁ, শুনতে পাই। তিনি বললেন, তবে তুমি মসজিদে উপস্থিত হবে।’ (সহীহ মুসলিম)

মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী গ্রন্থে আবুদ দারদা রা: এক বর্ণনায় রাসূল সা. এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো জনবিরল এলাকায় যদি তিনজন ব্যক্তিও বাস করে, আর তারা যদি নামাজের জামায়াত কায়েম না করে তবে অবশ্যই শয়তান তাদের ওপর চড়াও হবে।’

অলসতার কারণে যাদের ঈমানে দুর্বলতা আছে তারা এশা ও ফজরের নামাজে মসজিদে আসে না বা কম আসে। সাহাবিরা এমন ব্যক্তি সম্পর্কে মুনাফিক হওয়ার সন্দেহ করতেন। তাবরানিতে আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. বলেছেন, ‘যখন আমরা কোনো ব্যক্তিকে ফজর ও এশার নামাজের জামায়াতে না পেতাম তখন তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করতাম।’ (তাবরানি)

অকারণে ঘরে নামাজ পড়লে তা কবুল হবে না। হজরত আনাস ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আজান শুনে কোনো ওজর ছাড়া মসজিদে না গিয়ে একা নামাজ আদায় করে, তার এ নামাজ কবুল করা হবে না। লোকেরা বললেন, ওজর কী? জবাবে রাসুল সা. বলেছেন, ভয় ও রোগ। অন্য বর্ণনায় ভয়ও রোগের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ভয় বলতে প্রাণের ভয়। দুশমন, হিং¯্র জন্তু অথবা সাপ বিচ্ছুর কারণে এ ভয় হতে পারে।

নামাজের হিফাজতকারীকে ইসলামের প্রকৃত হেফাজতকারী বলা হয়েছে। যার মন মসজিদের সাথে লটকানো থাকবে কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর ছায়ায় আশ্রয় পাবেন। সেদিন এ ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।

Comments

comments

SHARE