সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব (রহঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, যখন আবূ ত্বালিব মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হ’লেন, রাসূল (সাঃ) তার নিকট গেলেন।আবূ জাহলও সেখানে ছিল। নবী (সাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ -কালেমাটি একবার পড়ুন, তাহ’লে আমি আপনার জন্য আল্লাহ্‌ নিকট কথা বলতে পারব।

তখন আবূ জাহল ও আব্দুললাহ ইবনু আবূ উমাইয়া বলল, হে আবূ ত্বালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হ’তে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবূ ত্বালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তা হ’ল, আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নবী (সাঃ) বললেন, ‘আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়’।এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হল

‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, তবুও যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী’ [সূরা তওবা – ১১৩]

আরো নাযিল হল:

‘আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না’ [ সূরা কাছাছ – ৫৬]

[ বুখারী হা/৩৮৮৪ ‘আনছারদের মর্যাদা’অধ্যায়, ‘আবু ত্বালিবের কাহিনী’অনুচেছদ ]

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রা:) হ’তে বর্ণিত যে, তিনি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন তাঁর সামনে তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের আলোচনা করা হ’ল, তখন তিনি বললেন, আশা করি কিয়ামতের দিনে আমার সুফারিশ তার উপকারে আসবে। অর্থাৎ আগুনের হালকা স্তরে তাকে ফেলা হবে। যা তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছাবে আর এতে তার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে (ঐ, হা/৩৮৮৫)।

শিক্ষা:
১. হেদায়েতের মালিক আল্লাহ্‌ তা‘আলা। তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়েত করেন, যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এজন্য সবসময় তার কাছে হেদায়েত চাইতে হবে।

২. জাহান্নামের আযাব অত্যন্ত ভয়াবহ।সবচেয়ে হালকা শাস্তি হওয়ার পরেও যদি আবূ ত্বালিবের এই অবস্থা হয়, তাহ’লে অন্যদের কি অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।

৩. সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানুষকে অনেক সময় হক গ্রহণ থেকে বিমুখ রাখে।

কাযা নামাযের বিধিবিধান

কেউ যথাসময়ে নামায পড়তে ঘুমিয়ে অথবা ভুলে গেলে এবং তার নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে, পরে যখনই তার চেতন হবে অথবা মনে পড়বে তখনই ঐ (ফরয) নামায কাযা পড়া জরুরী।

প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে তার কাফফারা হল স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া।” অন্য এক বর্ণনায় বলেন, “এ ছাড়া তার আর কোন কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) নেই।” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৬০৩ নং)

তিন আরো বলেন, “নিদ্রা অবস্থায় কোন শৈথিল্য নেই। শৈথিল্য তো জাগ্রত অবস্থায় হয়। সুতরাং যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার উচিৎ, স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া। কেন না, আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে তুমি নামায কায়েম কর।” (কুরআন মাজীদ ২০/১৪, মুসলিম, মিশকাত ৬০৪নং)

অতএব কাযা নামায পড়ার জন্য কোন সময়-অসময় নেই। দিবা-রাত্রের যে কোন সময়ে চেতন হলে বা মনে পড়লেই উঠে সর্বাগ্রে নামায পড়ে নেওয়া জরুরী। অন্যথা পরবর্তী সময়ের অপেক্ষা বৈধ নয়।

বিনা ওজরে ইচ্ছাকৃত নামায ছেড়ে দিলে বা সুযোগ ও সময় থাকা সত্ত্বেও না পড়ে অন্য ওয়াক্ত এসে গেলে পাপ তো হবেই; পরন্তু সে নামাযের আর কাযা নেই। পড়লেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। বিনা ওজরে যথাসময়ে নামায না পড়ে অন্য সময়ে কাযা পড়ায় কোন লাভ নেই। বরং যে ব্যক্তি এমন করে ফেলেছে তার উচিৎ, বিশুদ্ধচিত্তে তওবা করা এবং তারপর যথাসময়ে নামায পড়ায় যত্নবান হওয়ার সাথে সাথে নফল নামায বেশী বেশী করে পড়া। (মুহাল্লা, ফিকহুস সুন্নাহ্‌ ১/২৪১-২৪৩, ফিকহুস সুন্নাহ্‌ উর্দু ৭৮পৃ:, ১নং টীকা, মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ৫/৩০৬, ১৫/৭৭, ১৬/১০৫, ২০/১৭৪, মিশকাত ৬০৩নংহাদীসের আলবানীর টীকা দ্র:)
কেউ অজ্ঞান থাকলে জ্ঞান ফিরার পূর্বের নামায কাযা পড়তে হবে না। কারণ, সে জ্ঞানহীন পাগলের পর্যায়ভুক্ত। আর পাগলের পাপ-পুণ্য কিছু নেই। (আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ৩২৮৭ নং, মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ২৬/১২৮, ফিকহুস সুন্নাহ্‌ ১/২৪১, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ২/১২৬) ইবনে উমার (রাঃ) অজ্ঞান অবস্থায় কোন নামায ত্যাগ করলে তা আর কাযা পড়তেন না। (আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ, ফিকহুস সুন্নাহ্‌ ১/২৪১)

অবশ্য নামায পড়তে পারত এমন সময়ের পর অজ্ঞান হলে জ্ঞান ফিরার পর সেই সময়ের নামায কাযা পড়া জরুরী। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ২/১২৬-১২৭)

পক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি যদি কোন কারণে কোন বস্তু ব্যবহার করে স্বেচ্ছায় বেহুশ হয়, তাহলে তার জন্য কাযা পড়া জরুরী। (ঐ ২/১৮)

কাযা নামায পড়ার জন্য আযান ও ইকামত বিধেয়। কয়েক ওয়াক্তের নামায কাযা পড়তে হলে, প্রথমবার আযান ও তারপর প্রত্যেক নামাযের জন্য পূর্বে ইকামত বলা কর্তব্য।

এক সফরে আল্লাহর রসূল (সাঃ) সহ্‌ সাহাবাগণ ঘুমিয়ে পড়লে ফজরের নামায ছুটে যায়। তাঁদের চেতন হয় সূর্য ওঠার পর। অতঃপর একটু সরে গিয়ে তাঁরা ওযূ করেন। বিলাল (রাঃ) আযান দেন। (মুসলিম, সহীহ ৬৮১, আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান) অতঃপর সুন্নত কাযা পড়ে ইকামত দিয়ে ফজরের ফরয কাযা পড়েন। (বুখারী ৩৪৪, মুসলিম, সহীহ ৬৮০ নং, নাইলুল আউতার, শাওকানী ২/২৭)

খন্দকের যুদ্ধের সময় মহানবী (সাঃ) ও সাহাবাগণের চার ওয়াক্তের নামায ছুটে গেলে গভীর রাত্রিতে তিনি বিলাল (রাঃ) কে আযান দিতে আদেশ করেন। (শাফেয়ী, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ) অতঃপর প্রত্যেক নামাযের পূর্বে ইকামত দিতে বলেন। এইভাবে প্রথমে যোহ্‌র, অতঃপর আসর, মাগরেব ও এশার নামায পরপর কাযা পড়েন। (নাসাঈ, সুনান, আহমাদ, মুসনাদ, বায়হাকী প্রমুখ, ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ১/২৫৭)

উল্লেখ্য যে, ফজরের আযান দিনে দিতে হলেও ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” বলতে হবে। কারণ ফজরের ঐ কাযা নামাযে মহানবী (সাঃ) ফজরের সময় যা করেন, দিনেও তাই করে নামায আদায় করেছেন বলে প্রমাণ আছে। (মুসলিম, সহীহ ৬৮১নং, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ১/২০৪)

যে নামায যে অবস্থায় কাযা হয়, সেই নামাযকে সেই অবস্থা ও আকারে পড়া জরুরী। সুতরাং রাতের নামায দিনে কাযা পড়ার সুযোগ হলে রাতের মতই করে জোরে ক্বিরাআত করতে হবে। কারণ, মহানবী (সাঃ) যখন ফজরের নামায দিনে কাযা পড়েছিলেন, তখন ঠিক সেই রুপই পড়েছিলেন, যেরুপ প্রত্যেক দিন ফজরের সময় পড়তেন। (মুসলিম, সহীহ ৬৮১নং) তদনুরুপ ছুটে যাওয়া নামায রাতে কাযা পড়ার সুযোগ হলে দিনের মতই চুপে চুপে ক্বিরাআত পড়তে হবে। (নাইলুল আউতার, শাওকানী ২/২৭, আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/২০৪, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/৩১০)

তদনুরুপ কেউ মুসাফির অবস্থায় নামায কাযা করে বাড়ি ফিরলে, বাড়ি ফিরার পর নামায কসর করে না পড়ে পুরোপুরি পড়বে; কিন্তু ঐ কাযা নামায কসর করেই আদায় করবে। কারণ, সফর অবস্থায় তার কসর নামাযই কাযা হয়েছে। আর বাড়িতে থাকা অবস্থায় কোন ছুটে যাওয়া নামায সফরে মনে পড়লে বা কাযা পড়ার সুযোগ হলে তা পুরোপুরিই আদায় করতে হবে। মোট কথা যেমন নামায কাযা হবে, ঠিক তেমনিভাবে তা আদায় করতে হবে। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/৫১৮)

নবীজির দাফন এর দিন কি হয়েছিল , দাফন কেন দেরি হয়ে ছিল

সুরা আর রাহমান : ২৬-২৭) আরো ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।’ (আলে ইমরান : ১৮৫) অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে।
যখন তাদের মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহূর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে।’ (সুরা আল আরাফ : ২৪, সুরা ইউনুস : ৪৯) কাজেই নবী-রাসুলদেরও মৃত্যুবরণ করা বিধিবদ্ধ।
নবী-রাসুলদের ওফাত : নবী-রাসুলরা যেহেতু মানুষ ছিলেন, সেহেতু তাঁদের মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর মুহাম্মদ একজন রাসুল মাত্র।

তাঁর আগেও বহু রাসুল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন বা শহীদ হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে?
বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাআলা তাদের সওয়াব দান করবেন।’ (আলে ইমরান : ১৪৪)
তবে নবী-রাসুলদের এই স্বাধীনতা দেওয়া হয় যে আপনি কি পৃথিবীতে থাকতে চান? না কি চলে যেতে চান। কিন্তু নবী-রাসুলরা চলে যাওয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছেন (বুখারি, হাদিস : ৬৫০৯)
ওফাতকালীন অবস্থা : রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ অবস্থায় একদা আপন গোত্রের লোকদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘হে নবীর কন্যা ফাতেমা এবং হে নবীর ফুফু সাফিয়া!
নেক কাজ করো, নেক কাজ করো, আমি তোমাদের আল্লাহর হাত থেকে বাঁচাতে পারব না।’ ধীরে ধীরে রোগযন্ত্রণা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিন তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে কিছু স্বর্ণমুদ্রা জমা রেখেছিলেন। তিনি তীব্র রোগযন্ত্রণার মধ্যেও বলেন, ‘আয়েশা!
সেই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কোথায়, যা আমি তোমার কাছে জমা রেখেছিলাম? আমি কি আল্লাহর সঙ্গে এ অবস্থায় মিলিত হব যে আমার ঘরে স্বর্ণমুদ্রা। এগুলো বিতরণ করে দাও।’
রোগযন্ত্রণা কখনো বৃদ্ধি পাচ্ছিল আবার কখনো হ্রাস পাচ্ছিল। ওফাতের দিন সোমবার তিনি অনেকটা সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, তিনি তত ঘন ঘন বেহুঁশ হতে থাকেন।
এ অবস্থায় তাঁর পবিত্র জবানে উচ্চারিত হতে থাকে—তাঁদের দলভুক্ত করুন, আল্লাহ যাঁদের প্রতি অনুকম্পা করেছেন। কখনো বলতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি মহান বন্ধু!’
আবার কখনো বলতে থাকেন, এখন আর কেউ নেই, তিনিই মহান বন্ধু। এ কথাটি তিনবার উচ্চারণ করেন। তখন তাঁর পবিত্র আত্মা প্রিয় বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যায়।
ওফাতের সময় ছিল ১১ হিজরি, মাসটি ছিল রবিউল আউয়াল, আর তারিখ ছিল ১২, দিনটি ছিল সোমবার, সময় ছিল চাশত নামাজের শেষ, বয়স ছিল ৬৩, ওফাতের স্থান হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা—তাঁর কোল। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত হলো,
আমার কোলে রাসুল (সা.) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তাঁর মুখের লালার সঙ্গে আমার মুখের লালা একত্রিত হয়েছে।’ ঘটনাটি হলো, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রাসুল (সা.)-এর কাছে একটি মিছওয়াক হাতে নিয়ে এসেছিলেন, রাসুল (সা.) বারবার মিছওয়াকের দিকে তাকাতে দেখে হজরত আয়েশা বলেন, ‘আপনি কি
মিছওয়াক করবেন?’ তখন তিনি মাথা মোবারক নেড়ে সম্মতি জানালে হজরত আয়েশা (রা.) একটি মিছওয়াক নিয়ে মুখে চিবিয়ে নরম করে রাসুল (সা.)-কে দেন।
তিনি সেই মিছওয়াক দিয়ে মিছওয়াক করেন। আরো নেয়ামত হলো, তাঁর হুজরায় রাসুল (সা.) সমাহিত হন, তাঁর পবিত্রতায় কোরআনের আয়াত নাজিল হয় এবং তিনিই রাসুল (সা.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী।
ওফাত বিলম্বিত হওয়ার কারণ : মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেছেন সোমবার চাশতের শেষ সময়। মঙ্গলবার তাঁকে গোসল দেওয়া হয়। গোসল দিয়েছেন হজরত আব্বাস (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত আব্বাস (রা.)-এর দুই ছেলে ফজল ও সাকাম, রাসুল (সা.)-এর আজাদকৃত ক্রীতদাস সাকরাম, ওসামা বিন যায়েদ ও আউস ইবনে খাওলা (রা.)। গোসলের পর বিশ্বনবী (সা.)-কে তিনটি ইয়েমেনি সাদা কাপড়ে কাফন পরানো হয়,
অতঃপর ১০ জন ১০ জন করে সাহাবায়ে কেরাম হুজরায় প্রবেশ করে পর্যায়ক্রমে জানাজার নামাজ আদায় করেন। নামাজে কেউ ইমাম ছিলেন না। সর্বপ্রথম বনু হাশিম গোত্রের সাহাবিরা, তারপর মুহাজির, অতঃপর আনসার, তারপর অন্যান্য পুরুষ সাহাবি, অতঃপর মহিলা ও সর্বশেষে শিশুরা জানাজার নামাজ পড়ে।
জানাজার নামাজ পড়তে পড়তে মঙ্গলবার সারা দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-কে হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় দাফন করা হয়।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মৃতদের দাফন দ্রুত সম্পন্ন করো, বিলম্ব কোরো না।’ (বুখারি, হাদিস ১৩১৫) তার পরও মহানবী (সা.)-এর জানাজা ও দাফন বিলম্বিত হয়েছে। এর কারণ প্রধানত তিনটি।
১. তাঁর ওফাতের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে বিলম্বিত হওয়া : মহানবী (সা.)-এর ওফাতের খবর শুনে হজরত ওমর (রা.) জ্ঞানহারা হয়ে যান, তিনি দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, কিছু কিছু মুনাফিক মনে করে যে রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করেছেন, আসলে তিনি ইন্তেকাল করেননি।
তিনি হজরত মুসা (আ.)-এর মতো সেই প্রভুর কাছে গেছেন, আবার ফিরে আসবেন। আল্লাহর শপথ—‘যারা বলে, মুহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন, আমি তাদের হাত-পা কেটে ফেলব।’ হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) রাসুল (সা.)-এর ওফাতের সময় নিজ বাড়িতে ছিলেন,
খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসেন। তিনি ওমর (রা.)-কে শান্ত করার জন্য বসতে বললে ওমর (রা.) না বসেই আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তখন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উপস্থিত সব সাহাবির সামনে সুরা আলে ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। তখন সবাই শান্ত হয় এবং সবাই বুঝতে পারে যে আসলেই রাসুল (সা.)
ইন্তেকাল করেছেন। হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘হজরত আবু বকর (রা.)-এর মুখে মুহাম্মদ (সা.) শুধু রাসুল মাত্র, তাঁর আগেও বহু রাসুল গত হয়ে গেছেন… শ্রবণ করার পর মাটিতে ঢলে পড়েছিলাম এবং স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে রাসুল সত্যি ইন্তেকাল করেছেন।’ অতঃপর সবাই ওফাতের ব্যাপারে একমত হওয়ার পর দাফনকাজ সম্পন্ন করা হয়।
২। দাফনের স্থান নির্দিষ্ট না থাকা : মহানবী (সা.)-কে কোথায় দাফন করা হবে, তা সাহাবায়ে কেরামের জানা ছিল না। ফলে তাঁদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।
কেউ কেউ বলেন, জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হোক, কেউ কেউ বলেন, মসজিদ-ই-নববীতে দাফন করা হোক, আবার কেউ কেউ প্রস্তাব করেন হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পাশে সমাহিত করা হোক।
এমতাবস্থায় হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, নবী যেখানেই মৃত্যুবরণ করেন সেখানেই সমাহিত হন।’
অতঃপর হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় যেখানে রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করেন, সেখানে সমাহিত করার ব্যাপারে একমত হন।
৩। খলিফা নির্বাচনে ঐকমত্যে পৌঁছতে বিলম্ব : মহানবী (সা.)-এর স্থানে কে রাষ্ট্রের খলিফা হবেন, এ নিয়ে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল।
পরবর্তী সময় হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ব্যাপারে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছলে মহানবী (সা.)-এর দাফনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।
সংগৃহীত: পিএনএস নিউজ 24
আর্টিকেল টি তে কোনো ভুল থাকলে সংসুদনের জন্য অনুরোধ করা হলো

Comments

comments

SHARE