ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদের ইতিকথা সবাই কমবেশি জানে। এই বাবরি মসজিদ নির্মান করেন মুঘল বংশের প্রতিষ্ঠাতা বাবর।তার নামানুসারে বলা হয় বাবরি মসজিদ।১৯৯২ সালে উত্তর প্রদেশে অবস্থিত ষোড়শ শতকের এই মসজিদ ধ্বংস করতে হিন্দু জনতাকে উসকে দেয়া  হয়েছে ৷ সেই বাবরি  মসজিদ ভাঙতে প্রথম আঘাত করেছিলেন যে ব্যক্তি তার নাম বলবির সিং। সেই বলবির সিং আজ নওমুসলিম মুহাম্মদ আমের নামে পরিচিত। যে ব্যক্তি একদিন মসজিদ ভেঙে দিয়েছিলে তিনিই এখন পথে পথে ঘুরে আল্লাহ’র ঘর পুনর্নির্মাণ ও নতুন মসজিদ নির্মাণ করছেন এবং তিনি এখন লম্বা দাড়ি রেখে  ইসলামের দায়ী তথা প্রচারকের ভূমিকা পালন করছেন। ভেঙে পড়া শতাধিক মসজিদ সারাতে চান তিনি।

তিনি গত বুধবার কোলকাতা সংলগ্ন মহেশতলার জালখুরা মাদ্রাসায় ইসলাম প্রচারক হিসাবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। জালখুরা মাদ্রাসার বাৎসরিক অনুষ্ঠানে ইসলাম শান্তির ধর্ম বলে উল্লেখ করেন। তানার জীবন কাহিনী তুলে ধরেন।

বলবির সিং এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
জন্মসূত্রে নাম বলবির সিং । ১৯৭০ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের হরিয়ানা প্রদেশের পানিপথ জেলার এক রাজপুত পরিবারে জন্ম। বলবিরের বাবা ছিলেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বলবির সিংয়ের বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।

কিন্তু এ যেন প্রায়শ্চিত্ত! একসময় শিবসেনার সক্রিয় কর্মী বলবীর সিং হয়ে গেছেন মুহাম্মদ আমির। আল্লাহর নাম নেন সব সময়। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মসজিদে আজান দেন।

বাবরি মসজিদের মাথায় শাবল দিয়ে আঘাত করার পর সব হারিয়েছেন বলবীর। বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন তাকে। সে সময় তার স্ত্রীও সঙ্গে আসেনি। বাবার মৃত্যুর পর বাড়ি ফিরে শুনেছেন, বাবা নাকি বলে গেছেন, বলবীরের মুখ যেন বাড়ির কেউ আর না দেখেন। বলবীরকে যেন তার মুখাগ্নিও করতে না দেওয়া হয়।

 

২৫ বছর আগে বলবীরের সঙ্গে বাবরি মসজিদের মাথায় উঠেছিলেন যোগেন্দ্র পাল। শাবলের আঘাতে ভেঙেছিলেন মসজিদ। অনেক আগেই যোগেন্দ্র পুরোদস্তুর মুসলিম হয়ে গেছেন।

বদলে যাওয়ার ব্যাপারে বলবীর জানান, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, তার পরিবার কোনো দিনই উগ্র হিন্দু ছিল না। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর ইংরেজি, এই তিনটি বিষয়ে এমএ ডিগ্রি পাওয়া বলবীর নিজের মা, বাবা, ভাইবোনদের নিয়ে ছোটবেলায় থাকতেন পানি পথের কাছে খুব ছোট একটা গ্রামে।

বলবীরের বয়স যখন ১০ বছর, তখন তিনি ও তার ভাইদের পড়াশোনার জন্য বলবীরের বাবা দৌলতরাম তাদের নিয়ে চলে যান পানিপথে।

বলবীরের ভাষায়, আমার বাবা বরাবরই গান্ধীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি দেশভাগ দেখেছিলেন। তার যন্ত্রণা বুঝেছিলেন। তাই আমাদের আশপাশে যে মুসলিমরা থাকতেন, উনি তাদের আগলে রাখতেন সব সময়। কিন্তু পানিপথের পরিবেশটা ছিল ভিন্ন ধরনের। হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা লোকজনরা তেমন মর্যাদা পেতেন না পানিপথে।

ফলে একটা গভীর দুঃখবোধ সব সময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত বলবীরকে। সেই পানিপথেই একেবারে অচেনা, অজানা আরএসএসের একটি শাখার কর্মীরা বলবীরকে দেখা হলেই আপনি বলে সম্বোধন করত।

বলবীর জানান, সেটাই আমার খুব ভালো লেগেছিল। সেই থেকেই তাদের সঙ্গে আমার ওঠাবসা শুরু হয়। শিবসেনা করতে করতেই বিয়ে করি। এমএ পাস করি রোহতকের মহর্ষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ওই সময় প্রতিবেশীরা ভাবতেন আমি কট্টর হিন্দু। কিন্তু বাবা কোনো দিনই মূর্তিপূজায় বিশ্বাস করতেন না। আমরা কোনো দিনই যেতাম না মন্দিরে। বাড়িতে একটা গীতা ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি বা আমার ভাইয়েরা কেউই সেটা কখনও পড়িনি। পানিপথে কেউ বাম হাতে রুটি খেলেও তখন তাকে মুসলিম বলে হেয় করা হয়।

শিবসেনার লোকজনদের কাছ থেকে সম্মান পেয়ে তাদের ভালো লেগে যায় বলবীরের। শিবসেনাই তাকে অযোধ্যায় পাঠিয়েছিল বাবরি মসজিদ ভাঙতে। পাঠিয়েছিল বলবীরের বন্ধু যোগেন্দ্র পালকেও। তারা হয়ে যান করসেবক।

 

বলবীর জানান, বাবরি ভেঙে পানিপথে ফিরে যাওয়ার পর সেখানে তাকে ও যোগেন্দ্রকে তুমুল সংবর্ধনা জানানো হয়। তারা যে দুটি ইট নিয়ে গিয়েছিলেন বাবরির মাথায় শাবল চালিয়ে, সেগুলো পানিপথে শিবসেনার স্থানীয় অফিসে সাজিয়ে রাখা হয়।

কিন্তু বাড়িতে ঢুকতেই বলবীরের বাবা দৌলতরাম তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন। বলবীরের ভাষায়, বাবা আমাকে বললেন, হয় তুমি এই বাড়িতে থাকবে, না হলে আমি। তো আমিই বেরিয়ে গেলাম বাড়ি থেকে। আমার স্ত্রীও বেরিয়ে আসল না। থেকে গেল বাড়িতেই।

ওই সময় ভবঘুরের মতো জীবন কাটিয়েছেন বলবীর। জানিয়েছেন, লম্বা দাড়িওয়ালা লোক দেখলেই ভয়ে আতকে উঠতেন তখন। বেশ কিছুদিন পর বাড়িতে ফিরে জানতে পারেন, বাবা মারা গেছেন। তিনি বাবরি মসজিদ ভাঙায় যে দুঃখ পেয়েছিলেন বাবা, তাতেই নাকি তার মৃত্যু হয়েছে।

এর পর পুরনো বন্ধু যোগেন্দ্রের খোঁজখবর নিতে গিয়ে আরো মুষড়ে পড়েন বলবীর। জানতে পারেন, যোগেন্দ্র মুসলিম হয়ে গেছেন। যোগেন্দ্র নাকি তখন বলবীরকে বলেছিলেন, বাবরি ভাঙার পর থেকেই তার মাথা বিগড়ে গিয়েছিল। যোগেন্দ্রর মনে হয়েছিল পাপ করেছিলেন বলেই সেটা হয়েছে। প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে তাই মুসলিম হয়ে যান যোগেন্দ্র।

এর পরই আর দেরি না করে সোনেপতে গিয়ে মাওলানা কালিম সিদ্দিকির কাছে মুসলিম ধর্মে দীক্ষা নেন বলবীর। হয়ে যান মুহাম্মদ আমির।

প্রায়শ্চিত্ত করার ব্যাপারে বলবীর সিং ওরফে মুহাম্মদ আমির জানান, কম করে ভেঙে পড়া শতাধিক মসজিদ মেরামত করতে চাই। তার দাবি, ১৯৯৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে মেওয়াটে বেশ কিছু ভেঙে পড়া মসজিদ খুঁজে বের করে সেগুলো মেরামত করেছেন তিনি।

উত্তর প্রদেশের হাথরাসের কাছে মেন্ডুর মসজিদও নাকি সারিয়েছেন বলবীরই। সেই কাজে মুসলিমরাই তাকে এগিয়ে এসে সাহায্য করেছেন।

 

তথ্যসুত্র: এবিপি

Comments

comments

SHARE