১৯৭১ সালে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করা বীরসেনাদের দেওয়া হয় সম্মানণা।বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নানামুখী কল্যাণকর ব্যবস্থা নিলেও স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছরেও ভাগ্য বদলেনি পঞ্চগড়ের মুক্তিযোদ্ধা মুক্তু মিয়ার। ভাগ্য দোষে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভূক্ত না হওয়ায় আজ তাকে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। বিজয় দিবস আর স্বাধীনতা দিবস এখন তার মনে তেমন দাগ কাটে না। ওই দিনগুলোতেও তাকে বের হতে হয় ভিক্ষার থলি নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে।

 

দুমুঠো ভাতের জন্য আজও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে যে মুক্তু মিয়া অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের দেখিয়েছেন দুর্গম পথ সেই মুক্তু মিয়াকে জীবনের শেষ সময়ে দেখার কেউ নেই। বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তাকে সহযোগিতা করার ঘোষণা দিলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের মহারাজার দীঘি পাড়ের বাসিন্দা মুক্তু মিয়া। পথের ১০ গজ দুরেই তার থাকার একটি মাত্র ছোট ভাঙা কুঁড়ে ঘর। পড়নে ছেঁড়া পোশাক। চোখে পুরাতন ভাঙা চশমা দেওয়া। ভাঙা চশমার ঘোলা কাচের ভিতর দিয়ে তার ঘোলা চোখ দিয়ে পানি ঝড়ছে। ঘরের ভেতর ঢুকে দেখা যায় একটা চৌকি তার ওপর খড় বিছানো। তার উপর একটা কম্বল বিছানো। সাড়া ঘরে ছড়ানো ছিটানো ভিক্ষার নানা উপকরণ। বহু রঙের বিচিত্র কাপড়ে মুড়ানো তার ভিক্ষার কয়েকটি লাঠি।

স্থানীয়রা জানায়, শুরুতে স্বচ্ছলভাবে চললেও ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হয়ে মুক্তু মিয়াকে আজ ভিক্ষার থলি হাতে নিতে হয়েছে। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি। তাই আশি বছর বয়সেও তাকে প্রতিদিন বের হতে হয় ভিক্ষা করতে। রোজগারে ভিক্ষা থেকে যা পান তাই দিয়ে চলে তার সংসার। ৭ ছেলেমেয়ের সবাই ঢাকায় কাজ কর্ম করেন। কিন্তু কেউ তাকে সহযোগিতা করে না।

সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা বাছাই বোর্ডে তার নাম সর্বসম্মতিক্রমে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু তা স্থগিত হয়ে রয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তাকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মন্ডল তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভূক্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিলেও তাও থেমে আছে।

মুক্তু মিয়া বলেন, ৯ মাস যুদ্ধ করেছি। মুক্তিসেনাদের পথ দেখিয়েছি। দেশ স্বাধীন হলো আমার ভাগ্যে কিছু জুটলো না। এখন ভিক্ষা করে খাই। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় ডাকাতি করলো তারাই এখন বড় মুক্তিযোদ্ধা। অথচ আমার নাম এখনো মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভূক্ত হয় নাই।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মির্জা আবুল কালাম দুলাল জানান, সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা বাছাই তালিকায় সর্বসম্মতিক্রমে তার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে তা স্থগিত রয়েছে। আমরা চাই প্রকৃত মুক্তযোদ্ধাদের মধ্যে যারা এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি তারা তালিকাভুক্ত হোক।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানান, আমরা মুক্তিযোদ্ধা মুক্তুমিয়াকে একটি গৃহ নির্মাণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের সাধ্য মতো সহযোগিতা করবো।

উল্লেখ্য, ৬ নং সেক্টরের সাব সেক্টর ৬ এর ৩/এ মধুপাড়া কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার এ কে এম মাহবুব উল আলমের নেতৃত্বে অমরখানা ভিতরগড়সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় যুদ্ধ করেন মুক্তু মিয়া। টানা নয় মাস রেকি করা, গাইড, সংবাদ সরবরাহ কিংবা পাকসেনাদের ক্যাম্প আক্রমন সবকিছুতেই মুক্তিমিয়া অংশগ্রহণ করেন বীরত্বের সাথে। আজও সেই স্মৃতিগুলো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। চোখের সামনে ভেসে উঠে গোলাম গাউসের ছবি। তার চোখের সামনেই গোলাম গাউসকে ব্যয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে পাকসেনারা।

সূত্রঃকালেরকন্ঠ অনলাইন

Comments

comments

SHARE