বর্তমান সরকার ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে।আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রত্যেকটি কাজে বাংলাদেশ বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়ে আসছে।অথচ কিছুই পায়নি।তিস্তা চুক্তি হতে শুরু করে আরো অন্যান্য কাজেও বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি।

জাতীয় নাগরিকত্ব দপ্তরে আসামের নাগরিকদের তালিকা পাঠানোর পূর্বে আসাম সরকার একটি প্রাথমিক তালিকা প্রণয়ন করেছে। সেখানে ওই ৫০ লাখ লোককে নিজেদের নাগরিক বলে মেনে নিচ্ছে না আসাম সরকার। এই তালিকা প্রণয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ থেকে আসামে যে সকল বাংলাদেশি গিয়ে আবাস গড়েছে, তাদেরকে পুনরায় বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া।

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ আসামে ৫০ লাখ লোক নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সরকারের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ওই ৫০ লাখ লোক নিজেদের ভারতীয় প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৭১ সালের পূর্বে ওই নাগরিকরা বা তাদের পূর্ব-পুরুষরা আসামে ছিল, এমন কোন প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা নাগরিকত্ব হারাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে খোদ আসামসহ দেশের মানবাধিকার কর্মীরা আসাম সরকারের এমন পদক্ষেপে নিন্দা জানিয়েছে। মূলত আসামের সংখ্যালঘু মুসলিমদের তাড়াতেই আসাম সরকার এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি মানবাধিকার কর্মীদের।

রোহিঙ্গা গোষ্ঠীকে যেভাবে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেভাবে আসামের মুসলমানদেরও বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পায়তারা করছে আসাম সরকার।১৯৭১ সালে কি শুধু মুসলমানরা ভারতে আশ্রয় নেয় হিন্দুরা কি নেয়নি । আসাম সরকারের এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। দেশটি এরইমধ্যে মিয়ানমারের ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে নানা সংকটে ভোগছে।

উল্লেখ্য, আসামে ৩ কোটি ২০ লাখ লোক বাস করছেন, যেখানে ১ কোটিরও বেশি আছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। আসাম সরকারের কর্মকর্তা প্রতীক হাজেলা গত বুধবার আল-জাজিরাকে বলেন, ‘৪৮ লাখ লোক আসামে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। আসাম সরকার নাগরিকত্ব বিষয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর আগে গত জানুয়ারিতে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দুই প্রতিবেদনেই ৫০ লাখ জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের আসামের নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে’।

এদিকে ২০১৬ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি আসাম রাজ্যে জয় পাওয়ার পর থেকেই হিন্দুত্ববাদী এ রাজনৈতিক সংগঠনটি আসাম থেকে মুসলিমদের তাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিতে থাকে। আর তাদের ষড়যন্ত্রের প্রথম অংশ হিসেবে এনআরসি’র অধীনে নাগরিকত্ব শন্তাক্তের কাজ শুরু করে প্রদেশটির সরকার। অনেকেই বলছেন, প্রায় ৫ দশক ধরে আসামে বাস করছেন, অনেকেই তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছেন। তাই নাগরিকত্ব প্রমাণে, তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।

এমন অবস্থায় অর্থ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, জাতীয় নাগরিকত্ব প্রতিবেদনে যাদের নাম অন্তর্ভূক্ত হয়নি, তারা আসামের নাগরিক বলে গণ্য হবে না। তবে ওই ৫০ লাখ লোককে আসাম থেকে কোথায় তাড়িয়ে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনই কোন মন্তব্য করা যাবে না। প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে আসামের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে প্রায় ৪০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছিল স্থানীয় সরকার।

এদিকে বিশ্ব শর্মা বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যারা আসামে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের মধ্যে কেবল হিন্দুদের দেশটিতে থাকার অনুমোদেন দিবে আসাম সরকার। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ হিন্দু ও মুসলিম লোক ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে আশ্র নেয়।

এদিকে ১৯৮০ সালে আসামে অভিবাসী বিরোধী সহিংসতায় শতাধিক লোকের প্রাণহানির ঘটনায় ১৯৮৫ সালে বিক্ষোভকারী ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির আওতায় ১৯৭১ সালের পর প্রদেশটিতে আশ্রয় নেওয়া সকল নাগরিককে বিদেশি নাগরিক বলে চিহ্নিত করা হয়।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেও মিয়ানমার সরকার জাতীয় নাগরিকত্ব আইন ১৯৮২ প্রণয়ন করেন। সেখানেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে চিহ্নিত করা হয়। ওই আইনের মাত্র দুই বছরের মাথায় আসাম সরকার মিয়ানমারের পথ অবলম্বন করে আসামের কট্টোর হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে ওই চুক্তি করে।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের এক আদেশের পরই আসাম সরকার এনআরসি বাস্তবায়নে মাঠে নেমে পড়ে। আগামী ৩০ জুনের আসামের নাগরিকদের তালিকা সুপ্রিম কোর্টের কাছে জমা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেন আদালত। গত ফেব্রুয়ারিতে আসাম সরকার উচ্চ আদালতের কাছে আরও সময় চাইলে, উচ্চ আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেন।

এদিকে আসামের নাগরিকরা তাদের নাগরিকত্ব হারালে প্রদেশটিতে রাখাইনের মতো পরিস্থিতি নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ওই প্রদেশের মুসলিমরা। তবে মুসলিমদের সংখ্যা কোটির বেশি হওয়ায় সেখানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে, গৃহযুদ্ধও বেঁধে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

আল-জাজিরার সূত্র অবলম্বনে ekushey24

Comments

comments

SHARE