ইসলাম মানে শান্তি।আর এই শান্তির ধর্মের নামে বর্তমানে চলে অপপ্রচার।পৃথিবীর কোন দেশে হামলা হলেই মিডিয়াগুলো ঢালাও ভাবে প্রচার করে এটা মুসলিমদের দ্বারা হয়েছে।এর কারন হলো বেশির ভাগ মিডিয়াগুলো নিয়ন্ত্রন করে অমুসলিমরা।তাই তারা এই অপপ্রচার করে।এর একমাত্র কারন ইসলামের প্রশার।দিনদিন অমুসলিমরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে বলে।

ভারতের ইতিহাসের সাথে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। প্রতি বছর দেশটিতে শতাধিক মানুষ শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। যারা নিহত হচ্ছেন তাদের বেশির ভাগ সংখ্যালঘু মুসলমান কিংবা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় উৎসব পালনের নামে ভারতে নতুন করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ হত্যার নতুন প্রবণতা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি রামের জন্মদিন পালনের নামে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে পালন করা হচ্ছে রামনবমী উৎসব।

ক্ষমতাসীন বিজেপিসহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অস্ত্রশস্ত্রসহ বিশাল মিছিল নিয়ে এই উৎসব পালন করছে। যেখানে শিশুরাও অংশ নিচ্ছে। এবারের রামনবমী উৎসবে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পশ্চিমবাংলা ও বিহারও রয়েছে। রাম নবমীর মিছিল থেকে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে পশ্চিম বাংলার আসানসোলে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে আসানসোল নামটি খুবই পরিচিত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে আসানসোলের নাম। ফলে তার জীবনী পড়তে গিয়ে এ দেশের শিশুরাও জানে শহরটির নাম। কাজী নজরুল ইসলাম এই ছোট শহরটিতে কৈশোরে চা রুটির দোকানে কাজ করতেন।

এই শহরে রামনবমীর মিছিল থেকে ১৬ বছরের এক কিশোরকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এই শিশুর পিতা স্থানীয় নুরানী মসজিদের ইমাম ইমদাদুল্লাহ রশিদি। কিভাবে হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীরা তার সন্তানকে হত্যা করেছে, বিবিসি বাংলা এর বিবরণ তুলে ধরেছে। এই ইমামের ১৬ বছরের ছেলে মোহাম্মদ শীবগাতউল্লাহ দাঙ্গা শুরুর পর দু’দিন ধরে নিখোঁজ ছিল। বৃহস্পতিবার প্রথম তার লাশের সন্ধান পান তারা। ইমদাদুল্লাহ বলছিলেন, ‘ছেলেটা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল, একই সঙ্গে নানা জায়গায় কোরআন পড়তেও যেত। বুধবার যখন অশান্তি শুরু হয়, তখন নেহাতই কৌতূহলবশে দেখতে গিয়েছিল। আমার বড় ছেলে খবর দেয় যে একদল লোক ওকে টেনে নিয়ে যায়। পরের দিন জানলাম একটা মৃতদেহ পাওয়া গেছে ওটাই আমার ছেলের দেহ।’ ‘খুব যন্ত্রণা দিয়ে মেরে তো ফেলেইছে ছেলেটাকে, তারপরে দেহটা জ্বালিয়েও দিয়েছিল। এটা কেন করল ওরা!’

এই হত্যাকাণ্ডের খবর জানাজানি হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে আসানসোল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানকার পরিস্থিতি কেমন ছিল তার বিবরণ তুলে ধরেছেন সাংবাদিক জিম নওয়াজ। তিনি লিখেছেন, ‘আসানসোলের নূরানি মসজিদের ইমাম মৌলানা ইমদাদুল্লাহ্ রশিদির পুত্রকে হত্যা করেছে দাঙ্গাকারী সংঘীরা। অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বুক চিরে কলজে বের করে ইমাম সাহেবের পুত্রকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়েছে। পোস্টমর্টেমের পরে আসরের নামাজের আগে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিলেন প্রায় দশ হাজারের বেশি মানুষ। পরিস্থিতি ছিল খুবই ভয়ানক এবং উত্তপ্ত।

আসানসোলের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নাসিম আনসারীর বয়ান অনুযায়ী, ‘জানাজার ময়দানকে কারাবালার ময়দান বলে মনে হচ্ছিল। যুবকদের চোখেমুখে ফুটে উঠছিল প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিজ্ঞা। আমি প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, না আর আসানসোলকে রক্ষা করা গেল না।’ জানাজার নামাজ শুরুর আগে মৃত সন্তানের পিতা ইমাম ইমদাদুল্লাহ্ রশিদি খুদবা (বক্তব্য) দিতে উঠলেন। ইমাম সাহেবের উর্দু বক্তব্যের নির্যাসটুকু অনুলিখন করার চেষ্টা করলাম, ‘আল্লাহ্ আমার সন্তানের যতদিন আয়ু রেখেছিলেন, ততদিন সে বেঁচেছে। আল্লাহ্র ইচ্ছায় তার মৃত্যু হয়েছে। তাকে যারা হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদের কেয়ামতের ময়দানে শাস্তি দেবেন। কিন্তু, আমার সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার আপনাদের কারও নেই। আমার সন্তানের মৃত্যুর জন্য একটি মানুষের ওপরও আক্রমণ করা চলবে না। একটি মানুষকেও হত্যা করা যাবে না। বাড়িঘর, দোকানপাট কোথাও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাট করা চলবে না। ইসলাম আমাদের নিরীহ কোনো মানুষকে হত্যা করতে শেখায় না। ইসলাম আমাদের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রেখে বসবাস করতে শেখায়। আমাদের আসানসোলে আজ শান্তিশৃঙ্খলার প্রয়োজন। আপনারা যদি আমায় আপন মনে করেন, তাহলে ইসলাম নির্দেশিত শান্তি বজায় রাখবেন। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব আপনাদের। আর যদি, আপনারা শান্তি বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে ভাবব আমি আপনাদের আপন নই। আমি আসানসোল ছেড়ে চিরতরে চলে যাব।’

সাথে সাথেই পরিবেশ অদ্ভুতভাবে অত্যন্ত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। জানাজার নামাজ শেষ হয়। প্রত্যেকেই নিজের বাড়ি ফিরে যান। মৌলানা সাহেব ফিরে যান মসজিদে।

না, আসানসোলের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে শান্ত করার জন্য একজন পুলিশ বা একজন প্রশাসনিক লোকের দরকার পড়েনি। মৌলানা সাহেবের মোহিত করা বক্তব্যই পুরো পরিস্থিতিকে শান্ত করে দেয়।
বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলছে, ইমাম মুহাম্মদ ইমদাদুল্লাহ বুঝতে পারলেন, এই প্রতিহিংসার রাশ টানতে হবে এখনই। নইলে আরও রক্ত ঝরবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রাণ যাবে আরও মানুষের। একটা মাইক হাতে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে সবার প্রতি আবেদন জানালেন, আপনারা শান্ত হন। পুত্র হারানোর কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে গেল ইমামের। তবে তার মধ্যেও বলছিলেন, ‘এই অবস্থাতেও আমি সবার কাছে আবেদন করতে রাস্তায় বেরিয়েছিলাম সবাইকে বুঝিয়েছি যে আমার যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা যেন আর কোনো বাপ-মায়ের না হয় কেউ যেন দাঙ্গা না বাধায় ছেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।’

আসানসোলের নূরানি মসজিদের ইমাম পুত্র হারানোর বেদনা বুকে চেপে মানবিকতার জন্য রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। তিনি ধৈর্য, সহিষ্ণুতা আর প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু এর বিপরীতে ভারত যেন আরও বেশি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে। শুধু ধর্মীয় কারণ নয়, বর্ণবাদী আচরণ তীব্র হয়ে উঠছে। এই আসানসোলের বিজেপির এমপি বাবুল সুপ্রিয় সরাসরি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছেন। মুসলমানরা শুধু যে ভারতে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তা নয়। তুচ্ছ কারনে বর্নবাদী মনোভাব নিয়ে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে, গুজরাটে দলিত সম্প্রদায়ের যুবক ঘোড়া কিনে ঘোড়ায় পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর কারণে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের পৃষ্টপোষকতায় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটছে। একজন মানুষ কী খাবেন বা না খাবেন তা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে মানুষ হত্যার ঘটনা সভ্য সমাজে অকল্পনীয় হলেও ভারতে গরুর গোশত খাওয়া বা রাখার অপরাধে এখনো মানুষকে হত্যা করা হয়। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে গড়ে উঠেছে গোরক্ষা সমিতি। অথচ বিশ্বে সবচেয়ে গরুর গোশত রফতানিকারক দেশের একটি হচ্ছে ভারত আর রফতানিকারক ব্যবসায়ীরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গত বছরের (২০১৭) ২৯ জুলাইয়ের খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গরুর গোশত রফতানি কারক দেশ হচ্ছে ভারত। ২০১৬ সালে দেশটি ১ কোটি ১০ লাখ টন গরুর গোশত রফতানি করেছে।

ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় গত তিন বছরে প্রায় ৩০০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৭ সালেই কেবল ১১১ জন নিহত হয়েছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হংসরাজ আহির গত মাসে রাজ্যসভায় ওই তথ্য জানিয়েছেন। ২০১৭ সালে ৮২২টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় ১১১ জন নিহত এবং দুই হাজার ৩৮৪ জন আহত হন। ওই বছরে বিজেপিশাসিত উত্তরপ্রদেশে ১৯ টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ৪৪ জন নিহত হয়েছিলেন। একইভাবে বিজেপিশাসিত রাজস্থানে ৯১টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১২ জন নিহত হন। ২০১৬ সালে গোটা দেশে ৭০৩টি সাম্প্রদায়িক ঘটনায় ৮৬ জন নিহত এবং দুই হাজার ৩২১ জন আহত হন। একইভাবে ২০১৫ সালে গোটা দেশে ৭৫১ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ৯৭ জন নিহত ও দুই হাজার ২৬৪ জন আহত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে তৃণমূলশাসিত পশ্চিমবঙ্গে ৫৮টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ৯ জন নিহত ও ২৩০ জন আহত হন। বিজেপিশাসিত গুজরাটে একইভাবে ৫০টি ঘটনায় আটজন নিহত ও ১২৫ জন আহত হন।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালে কংগ্রেসশাসিত কর্নাটকে ১০০ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ২২৯ জন আহত হয়েছিলেন। একইভাবে বিজেপিশাসিত রাজস্থানে ৯১টি ঘটনায় ১২ জন নিহত ও ১৭৫ জন আহত হন। বিজেপি জেডিইউ জোটশাসিত বিহারে ৮৫টি ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৩২১ জন আহত হন। বিজেপিশাসিত মধ্যপ্রদেশে ৬০টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ১৯১ জন আহত হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের দেয়া ওই তথ্যে প্রকাশ, খোদ সরকারই স্বীকার করছে যে ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে বিজেপিশাসিত রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারতের এসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চিত্র প্রমাণ করে দেশটিতে মানুষের অধিকার কতভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সবসময় ভয় শঙ্কা ও অমানবিকতার মধ্যে বাস করছে। মৌলানা ইমদাদুল্লাহ রশিদির মতো কিছু লোকের আত্মত্যাগ আর মানবিক দায়িত্ববোধের কারণে কখনও কখনও ভারতে রক্তপাত এড়ানো যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো আসানসোলের এই নির্মমতা এবং পুত্র হারানোর এক ইমামের দায়িত্ববোধের খবর দেশটির গণমাধ্যমে তেমন গুরুত্ব পায়নি। যদিও শিল্পী কবির সুমন ইমামকে ভারত রতœ খেতাব দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, আসানসোলের নূরানি মসজিদের ইমামের জন্য ভারতরতœ দাবি করো, পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরোধের ডাক দাও।’ ইমাম রশিদির জন্য গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। লিখেছেন, ‘এই মুহূর্তে নূরানি মসজিদের ইমামকে গণসম্মান দেয়া হোক। আমরা সবাই তাকে প্রণাম করব।’

রামনবমী উৎসব পালনকে কেন্দ্র করে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এসব খবর বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়নি। হয়তো সাম্প্রদায়িক স্পর্শকাতরতার দিকটি এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। যদিও ভারতের নেতিবাচক খবর প্রচারের ক্ষেত্রে আমাদের গণমাধ্যমে এক ধরনের সেলফ সেন্সরশিপের প্রবণতা আছে। কিন্তু আসানসোলের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধে পুত্র হারানো এক ইমামের ভূমিকা ও তার আত্মত্যাগের খবর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সম্ভবত একজন ইমামের এই ভূমিকা আমাদের গণমাধ্যম প্রকাশ করতে চায়নি। ইসলামোফোবিয়ায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিশ্বের অন্য কোনো দেশের গণমাধ্যমের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। তার একটি উদাহরণ এটি। কিন্তু এমন খবর এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে আরও সংযমী, দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ও তাদের মানবিক শিক্ষার চেতনাকে শানিত করবে।

সূত্রঃনয়া দিগন্ত অনলাইন

Comments

comments

SHARE