নচিকেতার গানটা আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।আসলে উনি বাস্তবতা নিয়ে গান করেন এটা তার বড় প্রমাণ।কারন বর্তমানে আমাদর সমাজে যে হারে পিতা মাতার প্রতি অবহেলা চলছে তাই প্রমাণ করে।আসলে আমরা দিন দিন অমানুষে পলনত হচ্ছি।একবার ও ভআবি না যে এই বাবা মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করে তুলেছেন।

বাড়িতে প্রায় বিশটি টিন শেড পাকা ঘর। প্রতিটি ঘরই কারখানা শ্রমিকদের ভাড়া দেয়া। তিনটি ঘরে পরিবারসহ বাস করেন আনোয়ার হোসেন। ঘরগুলোর পাশে তিন ফিট-পাঁচ ফিটের একটি ছোট্ট ঘর। সেখানে রান্নাবান্নার কথা থাকলেও থাকতো গৃহপালিত হাঁস-মুরগী। আর ভাগ্য বিড়ম্বনায় সেই ঘরটিতে হাঁস-মুরগীর সাথে স্থান হয়েছে বাড়ির মালিক ৭০ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ শুক্কুর আলী’র।

শুক্কুর আলী আনোয়ার হোসেনের বাবা। একসময় বাড়ির সমস্ত জায়গা সম্পত্তির মালিকও ছিলেন শুক্কুর আলী। একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেন দু’বোনকে ঠকিয়ে সেইসব সম্পত্তি কৌশলে বাবার কাছ থেকে লিখিয়েও নেন। বাধ্য হয়ে নিয়তীকে মেনেই নিয়েছিলেন ৭০ বছরের শুক্কুর আলী, জীবনের আর যে কদিনই বেঁচে আছেন কস্ট করে হলেও থাকবেন ওই ছোট্ট ঘরেই কিন্তু ক্ষুধা তো আর মনের কথা বুঝে না। ক্ষুধার জ্বালায় খাবার চাইলেই মিলতো শারিরীক নির্যাতন। আর এ নির্যাতনের অংশীদার হতেন একমাত্র ছেলের বউ।

গত শনিবার (০৫ মে) দুপুরে খাবার চাওয়ায় ছেলে, ছেলের বউয়ের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন এ বৃদ্ধ। নির্যাতনের এক পর্যায়ে বৃদ্ধের মাথা ফেটে যায়। রক্তে ভেসে যায় বাড়ির পুরো আঙ্গিনা। এ ঘটনায় বৃদ্ধকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ির একটি ঘরে গতকাল থেকেই আটকে রাখা হয়, যাতে কেউ এ ঘটনা সম্পর্কে কিছু না জানতে পারে।

বিভিন্ন সময় নির্যাতনের বিষয়ে স্থানীয় সমাজপতিদের কাছে বিচার চাইলে শান্তনা পাওয়া ছাড়া কোন বিচার পাননি শুক্কুর আলী। সমাজপতিদের কাছে বিচার না পেয়ে অবশেষে নিরবে সকল নির্যাতন সহ্য করতেন বলে জানান তিনি।

অবশেষে রবিবার দুপুরে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা এ ঘটনা জানতে পেরে বৃদ্ধের বাড়ীতে উপস্থিত হলে ছেলে ও ছেলের বউ পালিয়ে যায়। এ সময় সাংবাদিকদের দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন শুক্কুর আলী। গত শনিবার শ্রীপুর পৌর শহরের কেওয়া পূর্ব খন্ড (কলিম উদ্দিন চেয়ারম্যান মোড়) গ্রামে ঘটনাটি ঘটে।

ছেলের বউয়ের হাতে নির্যাতনের শিকার শুক্কুর আলী (৭০) স্থানীয় মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে। অভিযুক্ত ছেলের বউ শামসুন্নাহার তাঁর একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী।

শুক্কুর আলী জানান, তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র আনোয়ার হোসেন, পুত্রবধূ ও নাতনীকে নিয়ে এ বাড়ীতে বসবাস করে আসছিলেন। গত এক বছর আগে ছেলে আনোয়ার হোসেন জোর করে তাঁর কাছ থেকে সমস্ত জমিজমা লিখে নেন। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে তাঁর উপর অত্যাচার। ছেলের বউয়ের অত্যাচারে টিকতে না পেরে গত কয়েক মাস আগে তাঁর স্ত্রী বড় মেয়ের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। আর ছয়মাস যাবৎ তাঁর আশ্রয় ঘটে তাদের পরিত্যক্ত রান্নাঘরে, যেখানে হাঁসমুরগীসহ এক ঘরে থাকতেই বাধ্য করা হয়েছে তাকে। যেখানে রোদ-বৃষ্টি ও মশার কামড় উপেক্ষা করে তাকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় কিছু চাইলেই তার উপর নেমে আসতো অমানুষিক নির্যাতন।

গত শনিবার দুপুর তিনটা পেরিয়ে গেলে তাকে খাবার না দেয়ায় তিনি নিজের খুপরি থেকে বের হয়ে ছেলের ঘরে সামনে এসে ছেলের বউয়ের কাছে খাবার চান। এ অপরাধে বৃদ্ধ শ্বশুরের উপর লাঠি দিয়ে নির্যাতন শুরু করেন ছেলের বৌ। এরই একপর্যায়ে ছেলে আনোয়ার হোসেনও এসে যোগ দেয়। লাথি দিয়ে ছেলে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়, ছেলের বউ লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে। পরে ঘরে থাকা দঁড়ি দিয়ে তাকে বেঁধে ঘরে ঝুলানোর প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু মাথা ফেটে অতিরিক্ত রক্ত বের হওয়ায় পরে তাকে আর ঝুলাননি তাঁরা।

এদিকে এঘটনায় তিনি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলে তাকে একটি ঘরে নিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে গভীর রাতে বাড়ীতে এক পল্লী চিকিৎসক এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। এ সময় তাঁর মাথায় ৭টি সেলাই দেয়া হয়। ঘটনার পরপরই তাঁর ছেলে ও ছেলের বউ এ ঘটনা সম্পর্কে কাউকে কিছু না বলার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।

বৃদ্ধ শুক্কুর আলীর কন্যা মাজেদা বেগম জানান, স্থানীয় মাধ্যমে রবিবার সকালে এ খবর শুনতে পেয়ে দেখতে আসেন। বাড়ীতে আসলে তাঁর বাবাকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। এ সময় তাঁর ভাই জানান, পা পিছলে তার বাবার মাথা ফেটে গেছে। পরে সে প্রতিবাদ করলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে মুল ফটকে তালা দিয়ে দেন তাঁর ভাই আনোয়ার হোসেন।

এ বিষয়ে বৃদ্ধের ছেলে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘তাঁর বাবার মাথায় একটু সমস্যা আছে। বিভিন্ন সময় উল্টা-পাল্টা কথাবার্তা বলে। বাবাকে নির্যাতন তো দুরে থাক তিনি খুব যত্ন করেন। শনিবার বাড়ির আঙিনায় পা পিছলে পড়ে গিয়ে তাঁর মাথা ফেটে যায় এবং তাকে চিকিৎসাও করানো হয়েছে। এছাড়াও এটা পারিবারিক বিষয়, বিকেলে (রবিবার) স্থানীয়রা বসে এটার সমাধান করে দিবেন।’

শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহসীন হোসাইন জানান, সংবাদ পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থল থেকে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

Comments

comments

SHARE