ভেজাল বর্তমানে কমন একটি শব্দ।আমরা ভেজাল ছাড়া কোন কিছু চিন্তা করতে পারি না।খাদ্য হতে শুরু করে অনেক কিছুই ভেজাল হচ্ছ।ভেজাল বিরোধী অভিযান তুলনামূকভাবে কম হওয়াও এর একটি কারন।ভেজাল দেয়া ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও দেশের শত্রু।আইনের মাধ্যেমে এদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে

ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ও রোহিতপুর ইউনয়নে পচা মিষ্টির রস দিয়ে তৈরি হচ্ছে বাহারি খেজুরের গুড়। এই গুড়ের অন্যান্য উপাদানের মধ্যে থাকছে পোকায় খাওয়া খেজুর, আটা, আখের রস, ফরমা, নাইট্রিক এসিড খাওয়ার সোডা, সাবান ও ইউরিয়া। এই গুড়ে এখন বাজার সয়লাব। রাজধানীর ফুটপাথের দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় বিপণিবিতানে বিক্রি হচ্ছে ওই গুড়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে এভাবে গুড় তৈরি করে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে আসছে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র।

ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জের জিনজিরায় একসময় শিশুদের খাবার দুধ থেকে নানা প্রসাধনীর নকল তৈরি করত একটি সিন্ডিকেট। বিভিন্ন সময়ে র্যাব, ডিবি ও থানা পুলিশের অভিযানে প্রায় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বন্ধ করা হয় রমজান মাসকে টার্গেট করা ভেজাল গুড় কারখানা। এসব কারখানায় দৈনিক কয়েক শ’ মণ গুড় তৈরি হয়। আমিনবাজার, নয়াবাজার, সাভার, যাত্রাবাড়ী, কাপ্তানবাজার, ভৈরব, টঙ্গি, গাজীপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্পট ছাড়াও কুমিল্লা ও রংপুরে পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে এসব ভেজাল গুড়। রমজান মাসকে টার্গেট করে বেশি উৎপাদন চলছে। সারা দিন রোজা রেখে বিভিন্ন শ্রেণীর শরবত খান রোজাদারেরা। তা ছাড়া গুড় দিয়ে লোভনীয় আইটেম তৈরি করেন গৃহস্থরা। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উপজেলার তেঘরিয়া ইউনিয়নের বাঘৈর ও রোহিতপুরে ছয়টি কারখানায় দিনরাত চলছে ভেজাল গুড় উৎপাদন।

সরেজমিন ক্রেতা সেজে গত ৮ মে উপজেলার তেঘরিয়া ইউনিয়নের বাঘৈর গ্রামের পাল বাতে পাঁচটি গুড়খানায় গিয়ে দেখা যায় ভয়ানক চিত্র। এসব কারখানার মালিকেরা হলেনÑ হরিপাল, খোকন পাল, রাজন পাল, অরুণ পাল ও রঞ্জিত পাল।

হরিপালের কারখানা : এ কারখানায় ঢুকতেই গুড় সাজানো রয়েছে থরে থরে। ডান পাশে ছোট-বড় বিভিন্ন ওজনের গুড়। আবার বড় বড় গুড়ের ঝালা দেখা গেছে এক পাশে। কারখানার পেছনে গিয়ে রস জ্বাল দেয়া, গুড় ঢালা, সোডা, ময়দা, মিষ্টির শিরা, পচা খেজুরসহ গুড় তৈরির নানা উপাদান চোখে পড়ে। সেখানেই ইঁদুর, বিড়ালের দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়ে। এসব চিত্র মোবাইলে ধারণ করতে চাইলে কর্মচারী রাজি হননি। তিনি জানান, পেটের দায়ে এখানে কাজ করি।

এখানকার গুড় পুরোটাই ভেজাল। মালিক জানলে চাকরি থাকবে না। তিনি জানান, এসব গুড় যৌথভাবে বিক্রি করেন পাঁচ মালিক। কারণ বিভিন্ন সময়ে আইনি ঝামেলা এড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেয় তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মচারী আরো জানান, কারখানা মালিক রাজন ৩০ বছর ধরে এ ব্যবসায় করছেন। তার চাচা গৌতম গত সপ্তাহে সাভারে বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি ভেজাল গুড় নিয়ে র্যাব ও পুলিশের হাতে আটক হন। পরে সাভার থানার মামলায় জেলখানায় এখন তিনি। তার ১৩টি ট্রাকে এসব গুড় পৌঁছানো হয় বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা মার্কেটে। এ ছাড়া থানা পুলিশ ছাড়াও ডিবি পুলিশের কিছু লোক নিয়মিত আসা-যাওয়া করে এখানে। আর মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে যায়।

রাজন পালের কারখানা : এখানেও ভিন্ন আইটেমের গুড় সাজানো রয়েছে। সেখানকার এক কর্মচারী বলেন, তাদের সাথে ব্যবসায় করলে অধিক লাভবান হওয়া যাবে। খেজুর ৮০ টাকা আর আখ ৬৫ টাকা করে বিক্রি হয় বলে ওই কর্মচারী জানান। বেশি নেয়ার কথা বললে মালিকের সাথে আলাপ করার পরামর্শ দেন। মালিক রাজন পাল চিনি দিয়ে গুড় তৈরির কথা স্বীকার করেন। তবে অন্য কোনো কেমিক্যাল দেয়া হয় না বলে জানান রাজন।

অন্য দিকে, খোকন পাল, অরুণ পাল ও রঞ্জিত পালের কারখানায়ও একই আইটেম তৈরি করা হয়। ওই সব কারখানায়ও সাজানো রয়েছে, খেজুর ও আখের গুড়। আবার বাঁশের খাঁচায় ও বস্তার ভেতরে গুড় দেখা গেছে। দাম একই।

রোহিতপুরে মিন্টু ঘোষ নামে এক গুড় ব্যবসায়ী ওই সব কেমিক্যাল দিয়ে খেজুর ও আখের গুড় তৈরি করে বলে অভিযোগ আছে। কেরানীগঞ্জ ইউএনও শাহে এলিদ মাইনুল আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, রমজান উপলক্ষে ভেজালবিরোধী কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটির প্রধান করা হয়েছে প্রতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে। আর ভেজাল কারখানার লিস্ট করবেন মেম্বাররা। কোনো ধরনের ভেজাল তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়ামাত্র ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া ভেজালবিরোধী অভিযানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াও সার্বক্ষণিক তার নেতৃত্বে একটি টিম থাকবে।

Comments

comments

SHARE